আমাদের এই দেশ চিরদিন বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত। ইহার বাণিজ্য খ্যাতিতে প্রলুব্ধ হইয়া আরবগণ স্মরণাতীত কাল পূর্ব হইতেই ইহার সহিত বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং দলে দলে আসিয়া এদেশে উপনিবিষ্ট হন। বাণিজ্য বিষয়ে তখন ইহার এতদূর শ্রীবৃদ্ধি সাধিত হইয়াছিল যে, ইতিহাস বিখ্যাত তাম্রলিপ্ত ও সপ্তগ্রামের সহিত ইহার ঘোর প্রতিযোগিতা চলিত। ইহার বাণিজ্য-খ্যাতি প্রাচ্যদেশে ছড়াইয়া সুদূর ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছিয়াছিল। খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে পর্তুগীজেরা আসিয়া এদেশে বাণিজ্য করিতে আরম্ভ করেন। তাঁহারা সপ্তগ্রামকে Porto Piqueno বা ক্ষুদ্র বন্দর এবং চট্টগ্রামকে Porto Grando বা বৃহৎ বন্দর নামে অভিহিত করিতেন। বাণিজ্য বিষয়ে ইহা যে তখন সপ্তগ্রাম অপেক্ষা বেশি উন্নত ছিল, তাহা ইহা হইতেই সহজে অনুমিত হইতে পারে। এই দেশের বাণিজ্য সমৃদ্ধি ইংরেজদিগকে এখানে আকর্ষণ করিয়া আনিয়াছিল। ওলন্দাজ কর্তৃক চুঁচুড়া হইতে বিতাড়িত হওয়ার পর ক্রমাগত হুগলী, বালেশ্বর ও হিজলী বন্দরের উপযোগিতা পরীক্ষার পর ইংরেজ কোম্পানী অবশেষে এই চট্টগ্রামকেই সর্বশ্রেষ্ঠ বন্দর বলিয়া মনোনীত করিয়াছিলেন। সেকালের মুসলমান নবাব ইংরেজদের তৎকালীন চট্টগ্রাম-বিজয়-বাসনার মূলে কুঠারাঘাত করিতে না পারিলে, সম্ভবত আমাদের এই চট্টগ্রামই ভারতে বৃটিশ সাম্রাজ্যের রাজধানী হইয়া পড়িত। এখন আমরা বেপারীর বেপারী তস্য বেপারীতে পরিণত হইয়া কোনরূপে কায়ক্লেশে জীবন ধারণ করিয়া আছি মাত্র। যে বাণিজ্য যুগ-যুগান্ত ধরিয়া কেবল মুসলমানেরই একচেটিয়া ব্যাপার ছিল, তাহা এখন ধীরে ধীরে অন্য জাতির হস্তগত হইতেছে; যে দেশে মুসলমান ভিন্ন অন্য জাতীয় ব্যবসায়ী খুব বিরল পরিদৃষ্ট হইত, আজ সে দেশে ক্রমেই ভিন্ন জাতীয় ব্যবসায়ীর দল বৃদ্ধি হইতেছে। ইহা পরিতাপের বিষয় হইলেও উপায় নায়। কারণ চিরদিন কাহারও কখন সমান যায় না এবং ভবিতব্যতার গতিও কেহ রোধ করিতে পারে না।
আমাদের এই ধন্য-দেশ পাহাড়-পর্বত-সঙ্কুল হইলেও একান্ত নদীমাতৃক। এজন্য ইহাতে বাণিজ্যের মত কৃষিরও বিস্তর সুবিধা রহিয়াছে। দক্ষিণে শঙ্খ ও মাতামুহুরি আর কর্ণফুলি নদী পূর্বাশার দূরদিগন্তস্থিত পর্বতমালা হইতে উৎপন্ন হইয়া পশ্চিম মুখে গিয়া অনন্ত বিস্তার বঙ্গোপসাগরের বারিরাশির সহিত কোলাকুলি করিতেছে। এই নদী তিনটি চট্টগ্রামের প্রায় সমগ্র সমতল ভূভাগকে সরসতা ও সজীবতা প্রদান করিয়া উহাকে শস্য-শ্যামল ও সুজল করিয়া রাখিয়াছে। বঙ্গোপসাগর সংগমে মহেষখালি, কুতুবদিয়া প্রভৃতি দ্বীপের উদ্ভব হইতে আমাদের জন্মভূমি কেবল সসাগরা নয়, সদ্বীপা আখ্যা ধারণেরও অধিকারিণী। কর্ণফুলি ও ফেনী নদীর স্রোত প্রবাহিত মৃত্তিকারাজিতে সন্দ্বীপ নামক প্রসিদ্ধ দ্বীপের উৎপত্তি। রাজকীয় বিধানে উহা নোয়াখালী জেলার অন্তর্গত হইলেও নানা কারণে চট্টগ্রামের ইতিহাসে উহার নাম একটা অবশ্য উল্লেখযোগ্য বিষয়। আরাকানের মগ, ত্রিপুরা, পর্তুগীজ ও মুসলমানের ভাগ্যচক্রের গতি বিনির্ণয়ে উহার কার্যকারিতা কত অধিক, তাহা আপনারা একটু পরেই দেখিতে পাইবেন। খ্রিস্টীয় ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে এই সন্দ্বীপের বুকের উপর দিয়া অনেক ভীষণ রণতরঙ্গের অভিনয় হইয়া গিয়াছে। চন্দ্রশেখর পর্বতের শিখরদেশ হইতে দক্ষিণ দিকে নয়ন ফিরাইলে দৃষ্টিচক্রবালে অনন্ত বিস্তার বারিধি-বক্ষে উহাকে ব্যাবিলনের শূন্যোদ্যানের মত এক ভাসমান উদ্যান বলিয়া প্রতীয়মান হইবে। প্রাগুক্ত বৃহৎ নদীগুলি ছাড়া চট্টগ্রামে অসংখ্য ক্ষুদ্র স্রোতস্বিনী প্রবাহিত রহিয়াছে। এই সকল স্রোতস্বিনী কামদুহা পয়স্বিনীর মত সারা বৎসর আমাদের কৃষিকার্যের জল সরবরাহ করিয়া থাকে। ইহাদের বক্ষের উপর দিয়া আমরা দেশীয় জলযান যোগে যেখানে সেখানে অনায়াসেই যাতায়াত করিতে পারি। অবাধ বহির্বাণিজ্যের স্রোত রুদ্ধ হইলে আমাদের কৃষিজাত ফল-শস্যে আমরা পরের মুখাপেক্ষী না হইয়া স্বচ্ছন্দেই জীবনযাত্রা নির্বাহ করিতে সক্ষম।
আমাদের প্রত্যন্তবাহী লবণাম্বু সমুদ্র আমাদের সম্বৎসরের লবণ যোগাইতে সর্বদা মুক্তহস্ত। কিন্তু, রাজবিধানে আমরা তাহা ব্যবহার করিতে পারি না। এদেশের সমুদ্র উপকূলে এক সময়ে লবণ প্রস্তুতের বিস্তৃত কারখানা বিদ্যমান ছিল। সেইসব কারখানা তখন অনায়াসে সমগ্র বঙ্গে লবণ যোগাইতে পারিত। এই ব্যবসায় এখন আমাদের একেবারে উঠিয়া গিয়াছে। কেন উঠিয়া গিয়াছে সেকথা বলিতে পারিব না। এখন ব্যবসায়টা উঠিয়া গিয়াছে, লবণের খাতগুলি বালুকাপূর্ণ হইয়া পড়িয়াছে বটে, কিন্তু লবণ পূর্বে যেমন ছিল, এখনও তেমনই আছে। শুনিয়াছি স্থানীয় দুষ্ট লোকেরা গোপনে লবণ তৈয়ার করিয়া পরে ধরা পড়িয়া সরকারের নিকট জরিমানা দেয়; কেহ কেহ সরকারী ডেকের খানা পর্যন্ত খাইয়া যায়। লিবারপুলী লবণই এখন আমাদের অবশ্য ব্যবহার্য। আমাদের কবি নবীনচন্দ্র কত আক্ষেপেই না গাহিয়া গিয়াছেন :
“লবণাম্বুরাশি বেষ্টিত যে স্থল,
জন্মে লিবারপুলে লবণ তাহার।”
লবণ ভিন্ন এই দেশে এক সময়ে উৎকৃষ্ট কাগজ তৈয়ার হইত। আমাদের পটীয়ায় - এই অভাজনের বাড়ির পার্শ্বেই সেই কাগজীপাড়া এখন শ্মশানের দগ্ধাবিশিষ্ট কাষ্ঠখণ্ডের মত দাঁড়াইয়া আছে। এই দেশের কাগজে সমস্ত দেশের কাজ চলিত। তখন সরকারী দপ্তরে পর্যন্ত এই কাগজই ব্যবহৃত হইত। ঢেঁকিযন্ত্রে রাত্রে শণ পাট ছেঁচিবার ধুম্ধুম্ শব্দে পার্শ্ববর্তী গ্রামবাসীদের নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটিত ; ইহা বড় বেশি দিনের কথা নহে। এখন এই কারবার একেবারে সমূলে উৎপাটিত হইয়াছে। এরূপ কাগজ সাধারণত ’হরিতালী কাগজ’ নামে পরিচিত। এই হরিতালী কাগজে লিখিত অসংখ্য প্রাচীন পুঁথি আপনারা প্রদর্শনী গৃহে দেখিতে পাইবেন।
আমাদের যোগী-জোলারা আমাদের লজ্জা নিবারণের উপযোগী পরিধেয় প্রস্তুত করিতে এখনও সম্পূর্ণ সমর্থ। আমাদের চতুর্দিগস্থ গভীর অরণ্যানী, গৃহনির্মাণের উপযোগী বাঁশ, বেত ইত্যাদি ইন্ধনোপযোগী কাষ্ঠাদি দ্বারা সতত আমাদের পরিচর্যায় নিরত। আমাদের নিত্য-ব্যবহার্য কোন দ্রব্যের জন্যই আমাদিগকে পরের মুখের দিকে তাকাইতে হয় না। পানীয় জলের জন্য আমাদিগকে অন্য দেশের মত চাতকের ন্যায় হাহাকার করিতে হয় না। আমাদের পুণ্যাত্মা পূর্বপুরুষদের খনিত অসংখ্য দীঘি ও পুষ্করিণীই আমাদের পানীয় জল যোগাইয়া থাকে। আমাদের এই দেশকে দীঘি ও পুষ্করিণীর দেশ বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। বাংলার আর কোন দেশে আমাদের মত এত দীঘি ও পুষ্করিণী আছে কিনা বলিতে পারি না। আমাদের প্রাচীন সুখ-সম্পদ ও এই দীঘি-পুষ্করিণীর কথা বিবেচনা করিতে গেলে আমাদের প্রাচীন কবি শেখ ফয়জুল্লাহর ’গোরক্ষ বিজয়ে’ বর্ণিত কথা কয়টি স্মরণ করিতে হয় :
“নাথে বোলে এই রাজ্য বড় হএ ভালা।
চারি কড়া কড়ি বিকাএ চন্দনের তোলা॥
লোকের পিঁধন দেখে পাটের পাছড়া।
প্রতি ঘর চালে দেখে সোনার কোমড়া॥
কার পখরির পানি কেহ নাহি খাএ।
মণি‐মাণিক্য তারা রৌদ্রেতে শুকাএ॥
ধন্য ধন্য রাজনগর করি এ বাখানি।
সুবর্ণের কলসে সর্ব লোকে খাএ পানি॥”
এই কথাগুলি আমাদের এই ধন্য দেশকে লক্ষ্য করিয়াই লিখিয়া গিয়াছেন বলিয়া আমাদের মনে হইয়া থাকে। কিন্তু হায় ! আজ শুধু আমাদের সেই দীঘি-পুষ্করিণী অতীতের সাক্ষীস্বরূপ পড়িয়া রহিয়াছে, কোথা হইতে কালের ঝঞ্ঝাবাত আসিয়া সুখ-সম্পদের সঙ্গে আমাদের সেই সোনার কলস ও মণি-মাণিক্যও উড়াইয়া লইয়া গিয়াছে।
আমাদের এই দেশ বাণিজ্যের জন্য – বিশেষত সামুদ্রিক বাণিজ্যে চিরপ্রসিদ্ধ, তাহা আগে একবার বলিয়াছি। এই বাণিজ্যের সর্বপ্রধান সহায় বাণিজ্য-তরণীর জন্য আমাদিগকে পরের উপর নির্ভর করিতে হইত না। এদেশেই সমস্ত জাহাজ নির্মিত হইত। চৈনিক পরিব্রাজক মাহুয়ান্ লিখিয়া গিয়াছেন, এই দেশের জাহাজ নির্মাণ প্রণালীর শ্রেষ্ঠতা হৃদয়ংগম করিয়া মহামান্য রোমের সম্রাট আলেকজেন্দ্রিয়ার ডক কারখানা এবং জাহাজ নাপছন্দ করিয়া এই চট্টগ্রাম হইতেই জাহাজ তৈয়ার করাইয়া লইতেন। এই শহরের দক্ষিণ দিকস্থ হালিশহর, পতেঙ্গা প্রভৃতি গ্রামে এদেশীয় শিল্পীর কর্তৃত্বে অনেকগুলি জাহাজ নির্মাণের কারখানা ছিল। এই সকল কারখানা তখন হাতুড়ির ঠক্ঠক্ শব্দে অহর্নিশি মুখরিত থাকিত। স্থাপত্য বিদ্যায় বর্ণজ্ঞানশূন্য অশিক্ষিত কারিগরেরা স্বীয় অমার্জিত বুদ্ধিবলে কেবল হস্তযন্ত্রের সাহায্যে যে প্রকাণ্ড জাহাজ নির্মাণ করিত এবং এখনও করিয়া থাকে, তাহা দেখিলে বিস্ময়ের সীমা থাকে না। এদেশের সওদাগরেরা তখন এককালে শতাধিক জাহাজের মালিক ছিলেন। হান্টার সাহেব লিখিয়াছেন, এই সকল জাহাজ নির্মাণের কারখানা ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্বীয় প্রভাব অক্ষুন্ন রাখিয়াছিল। বর্তমান ইউরোপীয় মহাসমরের গতিকে বিলাতি আগ্নেয় তরণীর সংখ্যা হ্রাস হওয়ায় সম্প্রতি আমাদের এই গৌরবের শিল্পটি নির্বাণোন্মুখ প্রদীপ-শিখার মত একটু উজ্জ্বলতর হইয়া উঠিয়াছে। জানি না ইহা জন্মের মত শেষ ঔজ্জ্বল্য কিনা। উক্ত মহাসমরের অবসানে বিলাতি জাহাজ আবার যখন পঙ্গপালের মত দেশ ছাইয়া ফেলিবে, তখন আমাদের এই সাধের শিল্পের পুনর্মুষিকীভবের বিশেষ সম্ভাবনা আছে, তাহা বোধ হয় না বলিলেও চলিবে। তাহা হইলেই ত ইহা একটা অতীত স্মৃতিবাহী কিংবদন্তী ও স্বপ্নকাহিনীতে পরিণত হইয়া যাইবে এবং কিছুকাল পরে আমাদের সন্তানেরাই ইহাকে পরীর গল্পের মত একটা উদ্ভট গল্পকথা বলিয়া মনে করিবে। সম্প্রতি এখানকার দোভাষী আবদুর রহমান সাহেব কয়েকখানি বৃহৎ জাহাজ নির্মাণ করাইয়া আমাদিগকে পালতোলা জাহাজের নির্মাণ-কৌশল দেখিবার সুযোগ দিয়াছেন। পঁচিশ-ত্রিশ বৎসর পূর্বে এই কর্ণফুলী নদীবক্ষে এই সকল জাহাজ শ্রেণীবদ্ধ রাজহংসীর ন্যায় ভাসমান থাকিয়া অপূর্ব শোভা বিস্তার করিত। আমাদের কবি নবীনচন্দ্র মনের আবেগে এক সময়ে গাহিয়াছিলেন :
“পল্লববিহীন একটি কানন
সিন্ধুবক্ষে যেন ভাসিছে, মরি।”
আপনারা এখন কর্ণফুলির বক্ষে সেই পল্লববিহীন কানন আর দেখিবেন না, কিন্তু জাহাজ মাস্তুলের দুই চারিটা পল্লববিহীন বৃক্ষমাত্র দেখিয়া দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া যাইতে পারেন। বাঙালি মস্তিষ্কের উদ্ভাবনী শক্তি ও বাহুবলের পরিচায়ক অনেক কীর্তিকলাপই দেশ হইতে একে একে লোপ পাইয়াছে। হায় ! আমাদের দেশের এই শেষ কীর্তিটুকুও অচিরে ইউরোপীয় তরণী বাহিয়া একেবারে জন্মের মত অদৃশ্য হইয়া যাইবে।
সমুদ্রাভিযানে এদেশের মুসলমানগণ চিরাভ্যস্ত। আপনারা বোধ হয় জানেন, বিলাতি জাহাজের লস্কর ও খালাসির মধ্যে অধিকাংশ লোকই এই দেশীয়। এদেশে এমন লোক অনেক আছে, যাহারা জলপথে পৃথিবী পরিভ্রমণ করিয়া পৃথিবীর নানা নগর ও বন্দর দর্শন করিয়া আসিয়াছে। ভারত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জ, চীনদেশ, ব্রহ্মদেশ, মালদ্বীপ, লাক্ষাদ্বীপ, আন্দামান, জাভা, সুমাত্রা, এমন কি সুদূর মিসর দেশ পর্যন্ত তখন আমাদের অনেকে যাতায়াত করিত। কারণ তখন ঐ সকল দেশের সহিত আমাদের বাণিজ্য সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। ভারতবর্ষের সহিত সামুদ্রিক বাণিজ্য সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্য চীন-সম্রাট ১৪০৫ খ্রিস্টাব্দে চেঙ্গহো নামক এক রাজদূতকে ভারতে প্রেরণ করেন। তাঁহার ভ্রমণবৃত্তান্ত পাঠে জানা যায় যে, তিনি আমাদের এই নগরেই অবস্থান করিতেন। পূর্বোল্লিখিত ইবনে বতুতা নামক প্রসিদ্ধ আরবীয় পর্যটক ১৪৪৩ খ্রিস্টাব্দে মালাবার উপকুল হইতে মালদ্বীপ হইয়া এই চট্টগ্রামে উপনীত হন এবং এই দেশের জাহাজে চড়িয়া জাভা দ্বীপ হইয়া চীন দেশে গমন করেন। এই সময়ে মাহুয়ান্ নামক আর একজন চীন দেশীয় ভ্রমণকারী এদেশে পদার্পণ করিয়াছিলেন। তাঁহার লিখিত বিবরণ হইতে জানা যায়, তখন চট্টগ্রাম তাম্রলিপ্তকে অতিক্রম করিয়া চীন এবং মালয় দ্বীপপুঞ্জের সহিত বাণিজ্য সম্বন্ধ সংস্থাপন করিয়াছিল। এই সকল স্থানের সহিত তখন চট্টগ্রামের একচেটিয়া বাণিজ্য ছিল। নৌবিদ্যাবিশারদ অনেক কাপ্তান, মালুম ও নাবিক এদেশে জন্মিয়াছিলেন। সেই বিদ্যার জোরে তাঁহার মহাসমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গমালা অগ্রাহ্য করিয়া অবলীলাক্রমে তরণী বাহিয়া চলিতেন। কিন্তু হায় ! এখন আমাদের ’তে হি নো দিবসাঃ গতাঃ’। আমাদের সেই পালতোলা বাণিজ্য তরণীও নাই, সেই কাপ্তান মালুমও নাই। ইতিহাসের পৃষ্ঠায় মাত্র এখন আমাদের সেই পূর্ব খ্যাতি বিরাজিত, – বাস্তব রাজ্যে তাহা নৈশ স্বপ্নবৎ অলীক।
মানুষ মানুষকে কত প্রেম করে তা ভাবতে গেলে আশ্চর্য হতে হয়। মহাজীবনের পশ্চাতে কতকগুলো ভক্ত-প্রাণ থাকে, যারা সর্ব অবস্থায় আপন ভক্তির দেবতাকে প্রেম করে ধন্য হন। হয়ত মহাজীবনের চাইতে এইসব ভক্তের মূল্য বেশি। এঁরাই আপন আপন শক্তি ও প্রেমের বলে মহাজীবনকে জয়যুক্ত করেন – যদিও জগৎ তাদের একজনকেও জানে না।
নেপোলিয়ন আপন সৈন্যদলের সম্মুখে বের হলে তাদের হৃদয় যেন এক প্রচণ্ড বিদ্যুৎ শিহরণে জেগে উঠত। প্রভুর পদশব্দের তালে তালে তাদের হৃদয়ে রক্ত তরঙ্গিত হতো। তারা অন্ধ আবেগে, আপন প্রভুর জন্যে প্রেমের মাদকতায় চেতনাশূন্য হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে জীবন দিত। এই অন্ধভক্তির প্রভাবে নেপোলিয়ন সারা ইওরোপের রাজা হয়েছিলেন। হুমায়ুন পথের ফকির হলেন – সিংহাসনচ্যূত নিঃস্বার্থ পথের ভিখারী ভারতের সম্রাট হুমায়ুনের পশ্চাতে তার কতিপয় বিশ্বস্ত প্রেমিক ভক্ত ছাড়া আর কেউ ছিল না। এই ভক্তের দল তাকে জয়যুক্ত করেছিল বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছিল, নিরাশার বুকে আশা দিয়েছিল। যখন আরবে পৌত্তলিকেরা প্রভু মুহাম্মদকে হত্যা করার জন্যে তরবারি হস্তে পশ্চাতে পশ্চাতে ছুটেছিল, তখন তার সঙ্গে ছিল দুই ভক্ত, তারা হলেন আলী ও আবুবকর। রসুলকে বাঁচান ছিল যাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ চিন্তা। নিজেদের জীবনের মায়া তাঁদের ছিল না। হলদিঘাটের মহাযুদ্ধে রানাপ্রতাপ মোগল হস্তে সাতটি আঘাত পেয়েছেন – তথাপি উন্নত অধীর আবেগে সমর উত্তেজনায় সম্মুখে অগ্রসর হয়েছে। তার একান্ত ভক্তজনেরা তাকে অনেকবার শত্রুচক্রের ভেতর হতে পশ্চাতে টেনে এনেছেন। তথাপি তিনি শত্রু নিধনে জ্ঞানশূন্য। শেষবারে ঝাঁসীয়া রাজ আপন প্রাণ দিয়ে তাঁকে পতন হতে রক্ষা করলেন। ভক্তের এই জীবনদানের ফলে সেদিন প্রতাপ রক্ষা পেয়েছিলেন, নইলে কিছুতেই রক্ষা পেতেন না।
পূজিত বীরের চাইতে তার রক্তদানের জীবনের মূল্য কোন অংশে কম নয়।
বীরকে জানা এবং তাকে সর্বপ্রকার প্রেম করা মহাজীবনের প্রকৃতি। ’মহামানুষ’ ছাড়া ’মহাজীবন’ কে অনুভব করতে পারে?
প্রাচীনকালে সভ্যতা, সৌন্দর্য ও শিক্ষার বিচিত্র লীলাভূমি ও কীর্তি মন্দির বলিয়া যে সমস্ত মহানগরী খ্যাতিলাভ করিয়াছিল, তন্মধ্যে গৌরবোন্নত, সৌন্দর্য-সমালঙ্কৃত, সমৃদ্ধিসম্পন্ন স্পেনের কর্ডোভা মহানগরী অন্যতম। বোগদাদ ব্যতীত কর্ডোভা মহানগরীর সহিত অপর কোনও নগরীর নামও উল্লেখিত হইবার যোগ্য নহে। স্পেনকে পরী বলিয়া কল্পনা করিলে কর্ডোভাকে তাহার চক্ষু বলিয়া স্থান দিতে হয়। প্রাচীন আরব ঐতিহাসিকগণ কর্ডোভাকে স্পেনের পাত্রী বা কনে (Bride) বলিয়া বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন। গৌরবের দিনে কর্ডোভার ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্য, শিক্ষা ও সভ্যতা, শিল্প ও বাণিজ্য, সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য, আমোদ-প্রমোদ ও বিলাস-উল্লাস, একত্র পুঞ্জীভূত হইয়া ইহাকে কবি-চিত্ত-সম্মোহন কল্পনাতীত সুন্দরী ও সুখময়ী করিয়া তুলিয়াছিল। পৃথিবীর নানা দিগদেশের ভ্রমণকারিগণ কৌতূহলাক্রান্তচিত্তে কর্ডোভার বিশ্ব-বিশ্রুত সৌন্দর্য-গরিমায় মুগ্ধ হইয়া তদ্দর্শনার্থে আগমন করিতেন এবং বিস্ময়বিস্ফারিত নেত্রে ইহার গঠন-সৌন্দর্য, পরিচ্ছন্নতা, সুখশান্তি এবং বিপুল ঐশ্বর্যচ্ছটায় স্তম্ভিত হইয়া মুক্তকণ্ঠে ইহার প্রশংসা কীর্তনে আপনাদিগকে চরিতার্থ মনে করিতেন।
মুসলমান-স্পেনের কর্ডোভা নগরী হইতে যখন সভ্যতার স্বর্গীয় প্লাবন, জ্ঞান-বিদ্যাশিক্ষার উত্তাল তরঙ্গমালা বক্ষে ধারণ করিয়া কুসংস্কার-জঞ্জাল পরিপূর্ণ ইউরোপকে বিপ্লাবিত এবং বিধৌত করিবার জন্য চতুর্দিকে তীব্রবেগে ছুটিয়া পড়িতেছিল, তখন বর্তমান জ্ঞানগর্বিত সভ্যতা-প্রদীপ্ত ইংরাজ, ফরাসী এবং জার্মান জাতির পূর্বপুরুষগণ পর্বতগহবরে এবং গভীর কাননাবাসে বন্য ফল-মূল এবং আম-মাংসে উদরপূর্তি করিয়া আপনাদের বন্যজীবন অতিবাহিত করিত।
নগরী-কুল-সম্রাজ্ঞী কর্ডোভা সুন্দরীর সৌন্দর্যচ্ছটা ও ঐশ্বর্যঘটা, খলিফাদিগের অজস্র অর্থ ব্যয় ও প্রাণগত চেষ্টা, ভাস্কর, কারু ও স্থপতিগণের আশ্চর্য কারূকৌশল ও গঠননৈপুণ্য এবং নাগরিকদের বিলাস-বিভ্রম-প্রিয়তায় বাসন্তী পূর্ণিমার কৌমুদীজাল বিস্নাত-নিসর্গের উন্মুক্ত সৌন্দর্যের স্বর্গীয় লীলাভঙ্গির বিচিত্র পটের ন্যায় প্রতীয়মান হইত। মহানগরী কর্ডোভার তুষার-ধবল-স্নেহমসৃণ মর্মর প্রস্তর-বিনির্মিত কারুকার্য-শোভিত অসংখ্য প্রাসাদ ও সৌধ, নানাজাতীয় সুস্বাদু, সুদৃশ্য ও সুগন্ধ ফলফুলের তরুলতা শোভিত মাধবী-সুষমাসম্পন্ন চিত্তবিনোদন উদ্যানাবলী, সুপ্রশস্ত পরিচ্ছিন্ন প্রস্তরাস্তরণাবৃত-ঋজুরখ্যাবলী, কমলদল-শোভিত সুপেয় স্বচ্ছ পয়োপুরিত প্রস্তর সরোবর সকল, শ্যামতৃণশস্প-মন্ডিত বিস্তৃত ময়দান নাগরিকগণের উৎকৃষ্ট ক্ষৌম পরিচ্ছদ, সদাচার ও সদালাপ, তাহাদিগের শাস্ত্রজ্ঞান এবং শাস্ত্রপটুতা, দিগ্বিজয়ী বীরেন্দ্রবৃন্দের অধ্যবসায় ও রণনৈপুণ্য, অধ্যাপক ও পণ্ডিতবর্গের জ্ঞানগর্ভ সমালোচনা, কলেজ ও পাঠশালার অসংখ্য ছাত্রের সহস্র কোলাহল, খরস্রোতা ওয়াদীঅল-কবীদের (গোয়াডেল কুইভার) মর্মর মণ্ডিত তীরে অধিবাসীদিগের সান্ধ্য ভ্রমণ, ময়দানে অশ্ব-ধাবন ও চৌগন-ক্রীড়া (পলো)। অপরাহ্নে এবং জ্যোৎস্না-স্নাত-প্রফুল্ল-যামিনীতে নদীবক্ষে নানা বর্ণের নানা আকারের তরণীমালার অভিযান,পথিক-ভ্রমণকারীদের আশ্রয়-গৃহ, নানা দেশীয় বিলাস-সামগ্রী-সম্ভারপূর্ণ বাজার ও বিপণিসমূহ, বিবিধ উৎকৃষ্ট, গ্রন্থপূর্ণ লাইব্রেরী, অসংখ্য স্নানাগার, নদী-তীরের হাওয়াখানা এবং বুরুজ, স্বর্ণচূড়া রমনীয় মসজিদসমূহ, অভ্রভেদী সুদৃঢ় দুর্গ, বিস্তৃত পরিখা এবং মনোহর রাজপ্রসাদনিচয় ইত্যাদির মনোরম দৃশ্যে ইহা ভুবনমোহিনী নগরীকুল-নারী বলিয়া বিশ্ব-বিশ্রুত খ্যাতিলাভ করিয়াছিল। ফলত, তৎকালের সুসভ্য ও সমুন্নত জাতির নাগরিক জীবনের যাবতীয় আবশ্যকীয় উপকরণ এবং দ্রব্য একত্র সম্মিলিত ও শৃঙ্খলিত হইয়া কর্ডোভাকে ভূস্বর্গে পরিণত করিয়াছিল। কর্ডোভার নাগরিকগণ সুশিক্ষিত এবং সুমার্জিত রুচিসম্পন্ন ছিলেন। কাব্য ও সঙ্গীতালোচনা, ললিতকলা ও সুকুমার বিদ্যাচর্চা সম্ভ্রান্তবর্গের আদরণীয় ছিল।
কর্ডোভা নগরী স্বীয় গৌরবের দিনে জ্ঞানালোচনা এবং শিক্ষার কোলাহলে যেমন মুখরিত তেমনি আবিষ্কার এবং উদ্ভাবনার মহিমায় শীর্ষস্থানীয় ছিল। নগরীর সৌন্দর্য,পরিপাট্য,ঐশ্বর্য এবং বৈচিত্র্য আশ্চর্যজনক ছিল, ইহার শিক্ষানুরাগ এবং জ্ঞানচর্চার বিপুল আয়োজন ও উপকরণ তদপেক্ষা কোন অংশে ন্যূন ছিল না। বাস্তবিক পক্ষে জগতের সেই দুর্দিনের উদ্ধারকারী’গৌরবের সন্তান’ মুসলমানগণের মধ্যে তৎকালে যে পৃথিবীগ্রাসিনী বিজয়-বাসনা এবং বিশ্বশোষিকা জ্ঞান-পিপাসা পরিদৃষ্ট হইত,তাহা স্পেন সাম্রাজ্যে সম্যকরুপে স্ফূর্তিলাভ করিয়াছিল, বরং কর্ডোভার বিজয়-বাসনা সংযত হইবার পরে জ্ঞানালোচনার আগ্রহ এবং উদ্যম সম্যকরূপে বিকশিত হইয়া উঠিয়াছিল। কর্ডোভা সমগ্র ইউরোপের জ্ঞান, বিদ্যা ও সভ্যতার কেন্দ্ররুপে পরিণত হইয়াছিল। ইউরোপের সমস্ত রাজ্য হইতে জ্ঞানপিপাসু সহস্র সহস্র ছাত্র,ধীসমৃদ্ধ বিজ্ঞানবিশারদ অধ্যাপকমন্ডলীর নিকট জ্ঞানাহরণার্থ সমবেত হইত। কর্ডোভার বিরাট বিজ্ঞানাগারে ছাত্রমন্ডলীকে যন্ত্রসংযোগে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব এবং রাসায়নিক বিশ্লেষণ শিক্ষা দেওয়া হইত। সাধারণের পাঠের জন্য সপ্তদশটি বিরাট লাইব্রেরী এবং বহুসংখ্যক পাঠসম্মিলনী (ক্লাব) ছিল।এতদ্ব্যতীত প্রত্যেক স্কুল-কলেজ এবং মস্জিদে ছাত্রমন্ডলীর এবং উপাসকদিগের পাঠের জন্য বিবিধ প্রয়োজনীয় গ্রন্থাদি রক্ষিত হইত। গৌরবের মাধ্যাহ্নিক কালে বত্রিশটি কলেজ এবং ৫০০ উচ্চশ্রেণীর সুপরিচালিত বিদ্যালয় কর্ডোভাতে বিদ্যমান ছিল। পাঠক মনে রাখিবেন, স্পেনে প্রত্যেক নগরেই স্ব-স্ব বিদ্যালয় এবং কলেজ ও পাঠশালাসমূহ বিদ্যমান ছিল। স্পেনের মহানগরী গ্রানাডাতেও ২০টি সুপরিচালিত কলেজ এবং বহুসংখ্যক স্কুল প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। স্পেনের প্রত্যেক সোলতান এবং আমীর অল্পাধিক পরিমাণে বিদ্যোৎসাহী ও জ্ঞানচর্চালিপ্সু ছিলেন বলিয়া স্পেন সাম্রাজ্য তখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের মধ্যাহ্ন মিহির-করে উদ্ভাসিত এবং বিশ্বজগতে প্রকাশিত হইয়া পড়িয়াছিল। প্রত্যেক সোলতানই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করিতেন। রাজ্যের সম্ভ্রান্তবর্গ এবং আমীরগণ সোলতানদিগের অনুসরণে বিরত ছিলেন না। শিক্ষার জন্য ধনাঢ্য ব্যক্তি হইতে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ব্যক্তিগণ পর্যন্ত স্ব-স্ব সম্পত্তির অধিকাংশ’ওয়াক্ফ’ করিয়া যাইতেন। তৎকালে যে ব্যক্তি বাটিতে ছাত্র’ জায়গীর’ এবং লাইব্রেরী না রাখিতেন, তিনি নিতান্ত অভদ্র এবং অশিক্ষিত বলিয়া সমাজে লাঞ্ছিত হইতেন। খলিফা হাকামের সময় প্রায় তিন লক্ষ ছাত্র এবং ছাত্রী কর্ডোভাতে অধ্যয়ন করিত। ভূগোল শিক্ষার জন্য গোলক (Globe) এবং মানচিত্র ব্যবহৃত হইত। কর্ডোভার’ রসদখানায়’ (মানমন্দিরে) বহুসংখ্যক নতুন যন্ত্র সংগৃহীত এবং নির্মিত হইয়া রক্ষিত হওয়ায় নানা দিগ্দেশ হইতে পন্ডিতমন্ডলী আগমন করিয়া জ্যোতির্বিদ্যার আলোচনা এবং নক্ষত্রাদির গতি নির্ধারণ করিতেন। বিদ্যোৎসাহী খলিফা হাকাম প্রভূত অর্থব্যয় করিয়া পৃথিবীর নানা রাজ্য এবং নানা রাজধানী হইতে বহু যত্নে শত শত লোক নিযুক্তি পূর্বক প্রায় ছয় লক্ষ মূল্যবান এবং দূষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রহ করিয়াছিলেন। ইতিপূর্বে পৃথিবীতে এরুপ বিরাট এবং মূল্যবান লাইব্রেরী আর কখনও স্থাপিত হইয়াছিল না।
ঘটিকা-যন্ত্রের দোলক এবং টেলিগ্রামের উদ্ভাবন এখানেই সর্বপ্রথম আবিষ্কৃত হয়। এখানেই সর্বপ্রথম বৈজ্ঞানিক যন্ত্রসংযোগে ৩২ ফুট উর্ধ্ব পর্যন্ত জলরাশি উত্তোলিত হয়। স্ত্রী-শিক্ষা পৃথিবীর মধ্যে সর্বপ্রথম এখানেই বিস্তৃতি এবং উন্নতি লাভ করে। মুরিস আরবগণ সন্তানের শিক্ষার অগ্রে সন্তানের মাতার শিক্ষার আবশ্যকতা পূর্ণভাবে উপলব্ধি করিয়াছিলেন। বালিকা এবং স্ত্রীলোকদিগের জন্য স্বতন্ত্র স্কুল এবং কলেজ বিদ্যমান ছিল। এখানেই মাতৃজাতির মধ্যে সর্বপ্রথম ইউরোপের বোগদাদের ন্যায় কবি, চিকিৎসক, অধ্যাপিকা, আইন-ব্যাখ্যায়িত্রী, ঐতিহাসিক এবং ধাত্রী পরিদৃষ্ট হইত। এখানেই হামেদা, হাফেজা, রোকেয়া, জয়নব, মোরিয়া, সোফিয়া, ফজল প্রমুখ বিদূষী এবং প্রতিভাশালিনী রমণীরত্ন জন্মগ্রহণ করিয়া স্পেনের জ্ঞানচর্চার গৌরব উন্নত এবং মহান করিয়া তুলিয়াছিল। অতীতের এই গরীয়সী মহানগরী কর্ডোভাতেই সমগ্র ইউরোপের মধ্যে সর্বপ্রথমে রমণীগণ জ্ঞানালোচনায় পুরুষদিগের সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। এখানেই একদিন বিজ্ঙানাগার এবং রসায়ন শিক্ষার প্রক্রিয়া (Experiment) এবং বিশ্লেষণ লইয়া মুসলমান ছাত্র ও ছাত্রীগণের মধ্যে বাদানুবাদ হইত। হায়! বর্তমানে এই মুসলমান জগতে এ সকল সম্পূর্ণরুপে অপরিজ্ঞাত এবং অদৃষ্ট। সকালে উঠিয়া কর্ডোভার রাজপথগুলিতে দৃষ্টি করিলে দেখা যাইত যে, দলে দলে বালক-বালিকা বিচিত্র বেশভূষায় সজ্জিত হইয়া স্কুল এবং কলেজের দিকে ছুটিয়াছে, ভ্রাতা এবং ভগিনীগণ হাত ধরাধরি করিয়া হাস্যমুখে পাঠগঠিত নানা প্রকারের প্রশ্নোত্তর এবং তর্ক-বিতর্ক করিতে করিতে পাঠশালায় চলিয়াছে। হায়! এই বিশ্বশোষিকা জ্ঞান-পিপাসার অপূর্ব চিত্র আবার কবে মুসলমান জগতে প্রতিভাসিত হইবে।
কর্ডোভাতে চিকিৎসাবিদ্যা আশাতীত উন্নতি লাভ করে। জালিনুসের (Galen) পরে চিকিৎসা-শাস্ত্রের ভৈষজ্যতত্ত্ব, রোগনিদান এবং শরীর-বিদ্যার বিবিধ অজ্ঞাত এবং দুর্জেয় তত্ত্ব এখানে আবিস্কৃত এবং সৃষ্টিকৃত হয়।
একাদশ শতাব্দীর সুপ্রসিদ্ধ ভিষক আবুল কাশেম (Albacasis) এখানেই তাঁহার অস্ত্র-চিকিৎসা আশ্চর্য নৈপুণ্য দেখাইয়াছিলেন। তাঁহার অস্ত্র-চিকিৎসার প্রণালী আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত ছিল। ঐতিহাসিকগণ তাঁহার অস্ত্র-চিকিৎসার অনেক আশ্চর্য কাহিনী লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। তাঁহার কিছুদিন পরে জগদ্বিখ্যাত ভিষকাচার্য এব্ন জোহর (Avenzoar) প্রাদুর্ভূত হন। তিনি বিবিধ প্রকারের ঔষধ এবং অস্ত্র প্রয়োগের অস্ত্রাদি আবিষ্কার করিয়া গিয়াছেন। প্রসিদ্ধ উদ্ভিদ্তত্ত্ববিদ্ এব্নে বতহের এখানেই জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি ঔষধসংক্রান্ত গাছ-গাছড়ার পরীক্ষার জন্য এশিয়া এবং আফ্রিকার বহু দেশ পর্যটন করিয়াছিলেন। তিনি ভৈষজ্য ঔষধি সম্বন্ধীয় বিরাট গ্রন্থ রচনা করিয়া গিয়াছিলেন। সুপ্রসিদ্ধ ইহুদী বংশাবতংশ চিকিৎসক হাসেদাইও এখানে আবির্ভূত হইয়াছিলেন। ইনি আশ্চর্য চিকিৎসা-কৌশলে নাভেরীর রাণী থিয়েডারীর অসাধারণ স্থুলত্বের লাঘবতা সাধন করেন। প্রসিদ্ধ পন্ডিত এব্নে রোস্দ (Avenrose) ইউরোপের গৌরবস্তম্ভ। তাঁহার ন্যায় দর্শনশাস্ত্রে প্রতিভা তৎকালে আর কাহারও পরিলক্ষিত হইত না। ইউরোপের আধুনিক দার্শনিকগণ সকলেই এব্নে রোস্দের নিকট ঋণী। সক্রেটিস এবং অ্যারিস্টটলের দার্শনিক মতের ইনিই জ্ঞানগর্ভ বিস্তৃত সমালোচনা করিয়াছিলেন। ইনি অনেক অস্ফুট দার্শনিক তত্ত্ব পরিস্ফূট এবং জটিল তত্ত্ব সরল করেন। ইহার দার্শনিক মতের উচ্চতা এবং সূক্ষ্মতার জন্য ধর্মান্ধ গোঁড়াগণের মধ্যে অনেক কোলাহল উপস্থিত হইয়াছিল।
আরবী সাহিত্যে এবং ইতিহাস এখানে চরম উন্নতি লাভ করিয়াছিল। শত শত পন্ডিত জন্মগ্রহণ করিয়া অমৃতনিস্যন্দিনী আরবী ভাষায় সাহিত্য এবং ইতিহাস রচনা করিয়া অমরত্ব লাভ করিয়াছিলেন। আমরা বাহুল্যভয়ে ঐতিহাসিক এবং সাহিত্যবিদ পন্ডিতদিগের আলোচনায় বিরত রহিলাম। মুসলমানগণ সর্বত্রই ইতিহাসের চর্চা এবং সেবা চিরকালই করিয়া আসিয়াছেন। অতি সামান্য সামান্য ঘটনা পর্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খরুপে সমালোচিত এবং লিখিত হইত। স্পেনের একখানি ইতিহাস সুবৃহৎ ৭০ খন্ডে রচিত হইয়াছিল। ভূমন্ডলের একাল পর্যন্ত কোনও দেশে এমন বিরাট ইতিহাস বিরচিত হয় নাই।
সংগীত এবং কবিতা কর্ডোভাতে সম্যকরুপে পুষ্টিলাভ করিয়াছিল। পৃথিবীতে সংগীত এবং কবিতার এমন হুড়াহুড়ি ইতিপূর্বে আর কোথাও দেখিতে পাওয়া যায় নাই। ভৃত্য এবং ক্রীতদাসগণ পর্যন্ত কবিতার আলোচনা করিত। স্পেনের লোক-চমকিত সৌভাগ্যের‘ সময় মধুবর্ষিণী আরব্য ভাষায় যে কবির তরঙ্গ উপস্থিত হইয়াছিল, তাহা পর্বত সমুদ্র উল্লঙ্ঘন পুরঃসর ইউরোপের নানাদেশে বিস্তৃতি লাভ করিয়াছিল। কোনও কথা বা কোনও উপদেশ কবিতায় আবৃত্তি ব্যতীত শেষ হইত না। কর্ডোভার সর্বত্রই অপরাহ্নে এবং রাত্রিতে সংগীতের মনোমোহিনী রাগিণী ঝংকার শ্রুত হইত। বাদ্যযন্ত্রের মধুর নিক্কণে এবং সংগীতের সুধাবর্ষণে কর্ডোভা পরীরাজ্য বলিয়া বোধ হইত। স্পেন, ইটালী এবং ফ্রান্সের ব্যালড (Ballads) কঞ্জোনেট (Conzonette) ট্রাবাজেয়র্স পান করিতেন; তিনি কদাপি আর কাহারও সংগীত শ্রবণ করিতে ইচ্ছা করিতেন না। জেরার বীণাতে পঞ্চম তারের সংযোজনা এবং কাচেঁর পানপাত্রের উদ্ভাবন এবং প্রচলন করেন। জেরার প্রত্যহ নূতন ধরনের বসন-ভূষণে সজ্জিত হইতেন; তৎকালে তাঁহার ন্যায়"ফ্যাসান দোরস্ত" ব্যক্তি সমগ্র স্পেনে আর একজনও পরিলক্ষিত হইত না। তাঁহার অমৃতময় সংগীতাবলী তদানীন্তন জগতে দ্রুত বিস্তৃত হইয়া পড়িয়াছিল। ফলত মহানগরী কর্ডোভার সংগীত এবং কবিতা-চর্চা অবর্ণনীয় এবং অপ্রমেয় ছিল।
স্থাপত্য এবং ভাস্কর্যের বিষয় আলোচনা করা অনাবশ্যক। কর্ডোভার রাজপ্রাসাদ এবং মসজিদমালার দৃঢ়তা এবং কারুকৌশল এখনও জগতের বিস্ময়ের বিষয় লইয়া পড়িয়াছে। সমগ্র স্পেনে মুসলমান স্থাপত্য শিল্পকৌশলের যে অপূর্ব গরিমা প্রদান করিয়াছিলেন, তাহা জগতের ইতিহাসে এক মহারহস্যের বিষয়াভূত হইয়া পড়িয়াছে। ইউরোপীয়গণ এই বিজ্ঞানোন্নত যুগেও তাহার অনুসরণ করিতে অক্ষম রহিয়াছেন।
ব্যবহারিক শিল্পে ইউরোপ এখন অনেক উন্নতি করিলেও, সৌন্দর্য, স্থায়িত্ব এবং দৃঢ়তায় স্পেনের রাসায়নিক শিল্পকে পরাস্ত করিতে পারে নাই। বস্ত্র শিল্প এখানে চরম উন্নতি লাভ করিয়াছিল।রেশম বয়নে আন্দালুসিয়া (স্পেন) পৃথিবীকে বিমুগ্ধ করিয়াছিল। এখানে রেশমের নানা প্রকারের সূক্ষ্ম এবং মসৃণ বস্ত্র প্রস্তুত হইত, ইউরোপের খ্রিস্টান রাজধানীসমূহে তাহার ব্যবহার হইত। পাঠক মনে করেন, এক কর্ডোভাতেই অন্যূন এক লক্ষ ৩০ হাজার তাঁতী কৌষের বয়নে নিযুক্ত ছিল। ভূমন্ডলে রেশমী পরিচ্ছেদের ব্যবহারে কর্ডোভা যাবতীয় নগরীকে পরাস্ত করিয়াছিল। আলমোরিয়া নগরে সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট গালিচা এবং সূক্ষ্ম বস্ত্র প্রস্তুত হইত।
ধাতব এবং মৃন্ময় পাত্রাদি অপূর্ব উন্নতি লাভ করিয়াছিল। তাম্র, কাঁসা, পিতল এবং মৃন্ময় বাসন-শিল্পে স্পেনীয় শিল্পীগণ অপূর্ব কৃতিত্ব প্রদর্শন করিয়াছিল। মেজর্কা দ্বীপের মৃৎপাত্রগুলি ইউরোপ এবং আফ্রিকার যাবতীয় বন্দরে এবং নগরে সাদরে বিক্রয় হইত। পরবর্তী সময়ে এই মেজর্কা দ্বীপে মৃন্মীয় বাসন-শিল্প ইটালীতে গৃহিত এবং বিস্তৃত হইয়া’মেজলিকা’ নামে খ্যাতিলাভ করে। মৃৎপাত্রগুলি স্বর্ণ এবং রৌপ্যরঞ্জিত হইয়া সৌন্দর্য ও ঔজ্জ্বল্য প্রকাশ করিত। আলমোরিয়াতে লৌহ, কাংস এবং কাচেঁর অসংখ্য প্রকারের বিচিত্র পাত্রাদি নির্মিত হইত। আলমোরিয়াতে কাঁচের একটি বিরাট কারখানা ছিল, এই কারখানায় উৎকৃষ্ট শ্রেণীর বিবিধ প্রকারের ঝাড়, ফানুস, লন্টন এবং জলপাত্রাদি প্রস্তুত হইত। হস্তিদন্তের খোদাই-শিল্প চমৎকার সৌন্দর্য এবং সূক্ষ্মতা লাভ করিয়াছিল। হস্তিদন্ত-নির্মিত মণিমুক্তা খচিত আধারসমূহ ইউরোপীয় রাজন্যবর্গের নিকট নিতান্ত প্রিয় বস্তু ছিল। খলিফা দ্বিতীয় হাকামের নামে উৎসর্গীকৃত একটি অতীব মনোজ্ঞ হস্তিদন্তরচিত পেটিকা জেরোনা নগরের খ্রিস্টীয় ভজনাগারে সযত্নে রক্ষিত হইয়া দর্শকের মনাকর্ষণ করিতেছে। স্পেনের সোলতান এবং আমীরদিগের অত্যদ্ভূত শিল্পকৌশলসম্পন্ন তরবারির বাঁটসমূহ এখনও ইউরোপীয় বিভিন্ন যাদুঘরে রক্ষিত রহিয়াছে। ধাতুশিল্পে কর্ডোভার শিল্পীগণ আশ্চর্য নৈপুণ্য প্রকাশ করিতেন। সামান্য সামান্য চাবি এবং তালাগুলি পর্যন্ত কারুকার্যে শোভিত হইত। আলমোরিয়া, সেভিল, টলেডো, মর্সিয়া এবং গ্রানাডা যুদ্ধের অস্ত্র-শস্ত্রাদির জন্য বিখ্যাত ছিল। টলেডোর তরবারি এবং ছুরিকা বহুমূল্যে বিক্রয় হইত। কাংসের চালাই কার্যে যথেষ্ট নৈপুণ্য পরিলক্ষিত হইত। বৃহৎ বৃহৎ কাংস-কপাটসমূহ যাহা এখনও খ্রিস্টানদিগের ভজনাগারের শোভা সম্পাদন করিতেছে, দর্শন করিলে বিস্মিত হইতে হয়। উজ্জ্বল কাংসনির্মিত ফানুস এবং ঝাড়সমূহে আশ্চর্যরুপে খোদাই কৌশল এবং চিত্রাঙ্কন পরিব্যক্ত হইয়াছে। গ্রানাডার সোলতান তৃতীয় মুহাম্মদের জন্য নির্মিত একটি মসজিদের বিচিত্র দর্শন আলোকাধার এখনও মাদ্রিদের মিউজিয়ামের রক্ষিত আছে। অলঙ্কার এবং জরীর কার্যের পারিপাট্য কায়রো এবং দামেস্ক অপেক্ষা কোনও অংশেই ন্যূন ছিল না। বস্তুত কর্ডোভা মহানগরী যেমন জ্ঞানচর্চায় এবং ঐশ্বর্যে, তেমনি শিল্প ও বাণিজ্যে পৃথিবীর মুকুটমণি স্বরুপ ছিল। যাবতীয় ঐতিহাসিকগণ কর্ডোভার লোক-চমকিত সৌভাগ্য এবং প্রতাপের বিশদ বর্ণনায় স্ব-স্ব ইতিবৃত্ত অলঙ্কৃত করিয়াছেন। হায় স্পেন, তোমার সেই গৌরব-কাহিনী অতীত কাহিনী, অধঃপতিত মুসলমানের প্রাণে কবে উন্নতি আকাঙ্ক্ষা পুনঃপ্রজ্বলিত করিবে?
যাদের হৃদয় অনুন্নত, তারা কি পথের ভিখারী রানাপ্রতাপ এবং সর্বহারা ইমাম হোসেনের জীবনের মূল্য বুঝতে পারে? আজ তের শত বছর ধরে মুসলিম জগতে কারবালা প্রান্তরের যুদ্ধে (?) মহররম উৎসব নামে সুসম্পন্ন হচ্ছে। বাঙালী মুসলমান সমাজ সেই মুসলিম জগতের একটি অংশ। তাঁরা সবাই নবীর ভক্ত, নবীর নামে দরুদ পড়েন, ইমাম হোসেনের জন্য শোকাশ্রু ফেলেন, মহররমের রোজা করেন – কিন্তু সত্যি কি তারা মহামান্য প্রিয়তম ইমাম হোসেনের মূল্য অনুভব করেছেন? কিছু না, কিছু না। যদি করতেন, তাহলে তারা স্বাধীনতার মূল্য বুঝতেন। রানা প্রতাপের ভাই মানসিংহ সম্রাট আকবরের মন্ত্রী হয়ে কত সুখেই না জীবন কাটাচ্ছিলেন। অন্যদিকে মহামান্য প্রতাপ পাহাড়ে পাহাড়ে স্ত্রী-পুত্র নিয়ে ঘাসের রুটি খেয়ে স্বাধীনতার গৌরব রক্ষা করেছেন। এই মহাপুরুষদ্বয়ের জীবনের মূল্য মুসলমান বোঝেন কি? বাঙ্গালী মুসলমানের কাছে একটা সাবডেপুটির পদ কত আকাঙ্ক্ষিত বস্তু। একটা দারোগার কাজ পাওয়া তার পক্ষে কত বড় ভাগ্যের কথা - মন্ত্রিত্ব পাওয়া তো দূরের কথা।
এজিদ বললেন – হোসেন একটুখানি বশ্যতা স্বীকার করলেই আমি তাকে মহা সম্মানে, সুখ ও সম্মানের আসনে বসাব। একটুখানি সে নত হোক।
ইমাম ঃ নবী দৌহিত্র ইমাম হোসেন সত্য ও ন্যায়ের মর্যাদা অস্বীকার করে জীবন, সম্পদ ও সম্মান চাননি। আপন জীবনের, আপন বংশের এবং আপন ভক্ত আত্মীয়-বন্ধুগণের হৃদয়-রক্ত দিয়ে মরুভূমির প্রতি বালুকণাকে স্বর্গের পুষ্পগন্ধে সুরভিত করে তুলেছিলেন – জেনেশুনে মৃত্যুর হলাহল অমৃত বোধে আকণ্ঠ পান করলেন। এই জীবন বলি, এই কোরবাণীই তাঁর কাছে গৌরবের মৃত্যু। হায় মুসলমান জাতি, তোমরা কারবালার মহামৃত্যুর মূল্য বুঝবে কি? কারবালার যুদ্ধে শুধু পুরুষ নয় নারীও আপন হৃদয়-রক্ত দিয়ে ইমামের স্বাধীনতাবোধের পূজা করেছিলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের শোণিতপণ অভিযানে যোগ দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পূজা শুধু পুরুষকে দিয়ে হবে না, নারীও চাই। পতনের সুগভীর গুহায় পড়ে মুসলিম নারী সমাজের শক্তি না হয়ে তাকে টেনে অন্ধকারের অতল তলে নামাচ্ছে। স্বাধীনতার মহাপূজারী মহাবীর রানার পত্নী স্বামীর পশ্চাতে পথে পথে ঘুরেছেন। মহাজীবনের পরম ভক্ত এই মহিয়সী নারীর সম্মান জগতের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। দেবশিশুগুলো রুটি খেয়ে স্বাধীনতার উপাসক পিতার পশ্চাৎ পশ্চাৎ হাসিমুখে ছুটেছেন। এসব জীবনের গৌরব সাধারণ মানুষ কি আত্মায় অনুভব করতে পারে? ঈশ্বরের চরম স্পর্শ যারা আত্মার বেদিতে পেয়েছেন, তারাই জানেন স্বাধীনতার পূজা কেমন করে করতে হয় – ঈশ্বরের পথে প্রকৃত কোরবানি কাকে বলে। বছর বছর মাংসের কাবাব খাওয়ার নাম কোরবানি নয়। ন্যায় ও বিজয়ের পথে জীবনের পরিপূর্ণ বিনোদনের নাম কোরবানি। জীবনের প্রতি কাজে, প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে সর্বদুঃখ জয় করে সত্যের পূজা করা – এটাই মহামানুষের জীবনের চরম ও পরম উপাসনা।
রানাকে এবং ইমামকে সে সময় অনেকেই বাতুল বলে উপহাস করেছিলেন – আল্লাহর মহা-দরবারে কিন্তু তাঁদের নাম সর্বোচ্চ স্তরে লিখিত হচ্ছিল। তাঁদের জীবনের দুঃখ বরণের এবং স্বীকারের মূল্য প্রকৃত মানুষ ছাড়া কে আত্মায় অনুভব করতে পারে? উত্তর – কেউই না।
হোসেন মরণ বরণ করেও সর্বত্র পূজিত। পৃথিবীর কোন জাতির মধ্যে ইতিহাসের কোন পৃষ্ঠায় অতীতে এবং বর্তমানে সত্য ও ন্যায়ের জন্য এমন স্বর্গীয় মরণ বরণের মহাদৃষ্টান্ত দেখা যায় না। আমরা কি এ মহাজনের অনুরাগী? রানা প্রতাপ পরাজিত হয়েও অনেক বিজয়ী সেনাপতির চাইতে শ্রেষ্ঠ, প্রতাপের মহাত্যাগের দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত বিরল। স্বাধীনতার পূজারী জগতের আর কে? যে জাতির মধ্যে এমন মানুষ জন্মেছেন, সে জাতি মানুষের সম্মান ও আত্মীয়তার যোগ্য।
কোন অজ্ঞাত বিষয়কে জানবার ও পাবার জন্য আত্মার আন্তরিক সাধনার নাম তপস্যা।
জগতের সমস্ত সুখ-সুবিধা ও সৃষ্টির পশ্চাতে মানুষের আন্তরিক বহুকালব্যাপী তপস্যা আছে! তপস্যা ছাড়া, সত্য উদ্ধারের সুকঠিন ব্রত ছাড়া জগতের কোন কল্যাণ-সাধন সম্ভব নয়। তপস্যার আন্তরিকতা, তন্ময়তা, আত্মার সুগভীর সুকঠিন বেদনা ব্যাকুলতা চাই। নইলে লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় না। হয়ত এক জীবনে কিছু হয় না। জীবনের পর জীবনে অসীম ত্যাগ, দুঃখ ও সহিষ্ণু অন্বেষণ শেষে জয়যুক্ত হয়। চিকিৎসাশাস্ত্র মানুষের বহুযুগের তপস্যার ফল। বিনা তপস্যায় কোন কিছু লাভ হয় না। বহুকাল বিদ্যালাভের চেষ্টা ব্যতীত কেউ বিদ্বান হয় না। কোন একটি বৈজ্ঞানিক যন্ত্র তৈরি একদিনে হয়নি! রেলগাড়ি, তার, উড়োজাহাজ, গ্রামোফোন সৃষ্টি, এ কি দুই-একদিনে হয়েছে?
সুখময়, চিন্তাভাবনাহীন, অন্বেষণহীন ব্যাকুলতা ও চেষ্টাহীন জীবনে কোন কল্যাণ লাভ হয়? মুসলমানদের মধ্যে বর্তমানে কোন তপস্যা আছে কি? মুসলিম জাতির পক্ষে এশিয়ায় ও ইউরোপে রাজত্ব স্থাপন কি সহজে সম্ভব হয়েছিল? নানা শাস্ত্রে তাদের কৃতিত্ব কি বহু তপস্যার ফল নয়? সে তপস্যা কই আমাদের এখন? আত্মার দিক দিয়ে যেন আমরা মরে গেছি। জীবনের চিহ্ন মাত্র নেই। ধর্ম ব্যাপারটা যা নাকি একেবারেই আত্মার বিষয়, তা তো এখন হয়েছে শরীরের ও ওষ্ঠের ব্যায়াম মাত্র। আল্লাহকে পাবার তপস্যাই বা আমাদের কৈ? মিথ্যা, মাদকতা, হিংসা, পরশ্রীকাতরতা, লোভ প্রভৃতি পশুভাবকে জয় করবার তপস্যা এসব জীবনের বড় কথা – তা তো আমাদের নেই। স্রোতের মুখে কাণ্ডারীহীন ভেলার মত চলেছি ভেসে।
জীবনহীনতার এই যে লক্ষণ – এ বড় সহজ বিষয় নয়। এই অহিফেন অবসাদ হয়ত তাকে একেবারেই ধ্বংসের পথে নিয়ে যাবে। তার আস্ফালন ও গর্বের কোন মূল্য নেই। জাতি হিসাবে জগতে তার অস্তিত্ব থাকবে না – থাকবে তার স্মৃতি, যেমন অতীতকালের ল্যাটিন ও গ্রীক জাতি কিংবা মুসলমান জাতি হবে জগতের গোলাম। দাসের জাতি; কিংবা ইহুদীদের মত – দেশহীন, জাতীয় সংঘবদ্ধতা বর্জিত, জাতীয়তাবোধহীন – জগতের পৃষ্ঠা হতে বিতাড়িত।
আল্লাহর শক্তি মানুষের ভিতর দিয়েই প্রকাশিত হয়। সেই ভাবময় জীবনময় সর্বশক্তির আধার, সর্বকল্যাণের উৎস, আদিশক্তির তপস্যা কই? তার জীবন-মন্দিরে প্রবেশের পথ মুসলমানদের জন্য রুদ্ধ হয়েছে। এ খুব নিরাশার কথা, কিন্তু খুব সত্য।
জীবনের কোন কল্যাণকর বিষয়ে আমাদের তপস্যা নেই – তপস্যা আছে একটি জিনিসের – দাসত্বের, পরপদলেহনের, জাতিকে, সমাজকে, গ্রামকে, মানুষকে ভুলে আত্মসুখসর্বস্ব, পত্নী ও সন্তানসর্বস্ব, জীবনের অনন্ত সম্ভাবনা বিস্তৃত চাকুরে জীবনের। ধিক্ আমাদিগকে। বড়লোক হবার, ব্যবসায়ে কৃতিত্ব লাভের, জাতির ভিতর মহাকাজ করবার, পৃথিবী-বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক হবার, কবি ও দার্শনিক হবার, বুজর্গ ফকির হবার কোন তপস্যা আমাদের নেই।
অতৃপ্তির হলাহল আকণ্ঠ পান না করলে কি মনুষ্য জীবনের মঙ্গলযাত্রা শুরু হয়? কোন অসন্তোষ, কোন অতৃপ্তি আমাদের নেই। যা আছি ভালই আছি, আল্লাহ ভালই রেখেছেন, এই হচ্ছে প্রভুর কাছে আমাদের সুতৃপ্তির উপাসনা।
কত নর-নারী হায়! জীবনে এদের কারো তীর্থযাত্রা নেই। যে যেখানে আছে, সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল।
একটা পূর্ণাঙ্গ, সুন্দর দুর্জেয় প্রেমময় মহাশক্তি সৃষ্টির প্রতিস্তরে কাজ করছে। এ শক্তি থেকে মানবচিত্ত প্রেরণা ও শক্তি লাভ করে। ঐ শক্তি মনুষ্যজ্ঞানের উৎস।
উপাসনা এই উন্নত মহাশক্তির কাছে চিত্তের প্রণতি, ভক্তি ও বশ্যতা!
উপাসনাহীন জীবন অপবিত্র। যে জীবন দিবা-রাত্রির কোন সময় প্রভুর অনন্ত প্রেমের কথা স্মরণ করে না – সে জীবন এক অফুরন্ত সম্পদ থেকে বঞ্চিত থাকে। কিন্তু যেভাবে মুসলমান জাতি বর্তমানে উপাসনার অভিনয় করে থাকেন – তা নিরর্থক। আত্মার সঙ্গে যে উপাসনার যোগ নেই তাকে কোনমতে উপাসনা বলা চলে না। প্রভুর সম্মুখে আত্মার পরম নির্ভরতা, পরম অনুতাপের অবস্থা, হৃদয়ের বিগলিত অবস্থার নাম উপাসনা। আবৃত্তি কখনও উপাসনা নয়।
প্রভুর পথে অন্যান্য জাতির তুলনায় মুসলমান জাতি হিসাবে প্রত্যহ পঞ্চাশ মাইল পিছিয়ে পড়ছে। তার আধ্যাত্মিক অগ্রগতি নেই। এ ক্ষতি কোনকালে পূরণ হবে না। কেউ কি প্রাণকে ফেলে দেহের পূজা করে? প্রাণহীন দেহের মূল্য কি? অথচ মোহবশত অনেকে দেহের পূজা করে। তোমাদেরও মোহ জন্মেছে। বোঝ না। ভাষার অর্থের প্রতি লক্ষ্য কর না – শুধু আরবী ভাষাকে সম্মান কর। অক্ষর কি ভক্তির যোগ্য? অমন যে পূজিত রাজার শরীর, যা জীবনে কত যত্নে, কত সুখে পালিত হচ্ছে, প্রাণহীন হলে তাও দুর্গন্ধ এবং ঘৃণিত হয়ে ওঠে – সে শরীর কেউ ঘরে রাখে না। যখন অর্থবোধ হয় না – তখন আরবী ভাষায় কোন মূল্য নেই। তোমরা শুধু মোহবশত ভাষাকে ভালবাস – এ তো পৌত্তলিকতা। তোমরা তো পৌত্তলিক। অন্তরে যদি ভাব না থাকে, অনুভূতি না থাকে, তবে আল্লাহ্ তোমাদের প্রার্থনা গ্রহণ করতে পারেন না – কারণ অন্তরে তোমার কোন ভাব বা অনুভূতি নেই। ভাষা তো মানুষের তৈরি – ভাব মানবচিত্তে প্রথম জাগে, মানুষ নিজেদের প্রস্তুত ভাষায় তাই প্রকাশ করে। যে চিত্তে ভাব নেই, অনুভূতি নেই, তার ওষ্ঠের ভাষা আল্লাহ্ বোঝেন না। আল্লাহ্র কাছে তা পৌঁছে না। কি তুমি চাও তা নিজেই জান না – আল্লাহ্ তোমায় কি দেবেন?
না বুঝে প্রার্থনার ভঙ্গি করা, কোরান পড়া মহাপাপ। এই মহাপাপে মুসলমান জাতের সর্বনাশ হয়েছে, তার সমস্ত উন্নতির পথ বন্ধ হয়ে গেছে। মুসলমান নরনারী ধর্মহীন, আল্লাহ্হীন, শক্তিহীন জীবনের সর্বকল্যাণ আর্শীবাদ হতে সে বঞ্চিত। তার জীবন ভয়াবহ অন্ধকারে ভরা, ঘোর অশান্তিতে পূর্ণ, আগুনে সে পুড়ে মরে।
আল্লাহই মানুষের শক্তি ও প্রেরণার উৎস। মুসলিম জীবনে শক্তি ও প্রেরণা নেই – তার জীবনে কোন পরম ভরসা ও নির্ভরতা নেই। একটি মৌখিক বিশ্বাস সে করে মাত্র। জাতি হিসেবে তার যে সর্বনাশকর ক্ষতি হচ্ছে, তার মীমাংসা কোনকালে হবে না।
প্রার্থনা সব সময় স্বরচিত ও মাতৃভাষায় হওয়া উচিৎ। দু-একটি মাত্র আল্লাহ্র কালাম সমাজে ঐক্য রক্ষার জন্য প্রার্থনায় ব্যবহার কর, বাকি সমস্তই আপন আত্মার রচিত কথা হওয়া উচিৎ। আল্লাহ্র কালাম অর্থাৎ কোরান পুনঃ পুনঃ বুঝে পাঠ করলেই আত্মার প্রার্থনাকালে ভাষা আপনা থেকেই আসবে। আল্লাহ্র গ্রন্থের রস গ্রহণ করে নিজের রক্তমাংসের অংশ করে ফেল।
Bengal Education Conference. The All India Muslim League-এর মত অবিলম্বে (তোমাদের যখন কোন আমীর নেই তখন জাতিকেই আমীরের আসন গ্রহণ করতে হবে) ধর্ম সম্বন্ধে কি আমাদের কর্তব্য তা নির্ধারণের জন্য সমস্ত পণ্ডিতমণ্ডলীকে নিয়ে একটা Bengal Religious Conference নামে সভা গঠিত হওয়া উচিৎ। দীর্ঘ লম্বাচওড়া বিশ-তিরিশ রাকাত (দুই প্রণতিতে এক রাকাত) নামাজ বাদ দিয়ে ইমামের (Priest) ধর্মভাব-উদ্দীপক, প্রেম ও ভক্তিধারবর্ধক দীর্ঘ বক্তৃতা (Sermon) হওয়া অতি আবশ্যক। প্রার্থনায় সঙ্গীতের অনুষ্ঠান হওয়া কোনমতে অন্যায় নয়। প্রচলিত প্রার্থনার ভাষা গান ছাড়া আর কি? সুমিষ্ট কণ্ঠস্বর বিশিষ্ট ব্যক্তিকেই ইমাম বলা হয়।
প্রত্যেক মহাজীবনের অন্তরালে প্রার্থনা আছে। মোস্তফা কামাল পাশা নিজের বলে জাতীয় জীবনে একটা পরিবর্তন এনেছেন এরূপ মনে করা বড়ই ভুল, অথচ একটা মূল্যহীন বাঙ্গালী মুসলমান তাকে অধার্মিক বলতে একটুও দ্বিধাবোধ করে না। প্রার্থনা প্রত্যেক মহাজীবনের পশ্চাতে থেকে তার জীবনের সমস্ত শক্তির রস গোপনে সরবরাহ করে। বাইরের লোক তা অনুভব না করতে পারলেও একথা মিথ্যা নয়।
শুক্রবার আমাদের সাপ্তাহিক উপাসনার দিন, প্রত্যেক মসজিদে অধীনস্থ অধিবাসীদের চাঁদার দ্বারা প্রতিপালিত সুশিক্ষিত একজন গ্র্যাজুয়েট ইমাম সমবেত ব্যক্তিগণকে যাতে ধর্মভাবে মুগ্ধ এবং প্রতি সপ্তাহে সকলের আত্মাকে উন্নততর করে গড়ে তুলতে পারেন, তার চেষ্টা করা একান্ত আবশ্যক। কেউ যেন উপাসনায় এসে না বলে – ’তাড়াতাড়ি সেরে ফেলুন’। তার নাম কি উপাসনা? ছি!