সুকান্তের কবিতা

সংগ্রহ

ছাড়পত্র

সূচীপত্র

ভেজাল

ভেজাল, ভেজাল ভেজাল রে ভাই, ভেজাল সারা দেশটায়,
ভেজাল ছাড়া খাঁটি জিনিষ মিলবে নাকো চেষ্টায়!
ভেজাল তেল আর ভেজাল চাল, ভেজাল ঘি আর ময়দা,
‘কৌন ছোড়ে গা ভেজাল ভেইয়া, ভেজালসে হ্যায় ফয়দা।’
ভেজাল পোশাক ভেজাল খাবার, ভেজাল লোকের ভাবনা,
ভেজালেরই রাজত্ব এ পাটনা থেকে পাবনা।
ভেজাল কথা— বাংলাতে ইংরেজী ভেজাল চলছে,
ভেজাল দেওয়া সত্যি কথা লোকেরা আজ বলছে।
‘খাঁটি জিনিষ’ এই কথাটা রেখো না আর চিত্তে,
‘ভেজাল’ নামটা খাঁটি কেবল আর সকলই মিথ্যে।
কলিতে ভাই ‘ভেজাল’ সত্য ভেজাল ছাড়া গতি নেই,
ছড়াটাতেও ভেজাল দিলাম, ভেজাল দিলে ক্ষতি নেই॥
    

বিয়ে বাড়ির মজা

বিয়ে বাড়ি: বাজছে সানাই, বাজছে নানান বাদ্য
একটি ধারে তৈরী হচ্ছে নানা রকম খাদ্য;
হৈ‐চৈ আর চেঁচামেচি, আসছে লুচির গন্ধ,
আলোয় আলোয় খুলি সবাই, কান্নাকাটি বন্ধ,
বাসরঘরে সাজছে ক’নে, সবাই উৎফুল্ল,
লোকজনকে আসতে দেখে কর্তার মুখ খুলল:
“আসুন, আসুন— বসুন সবাই, আজকে হলাম ধন্য,
যৎসামান্য এই আয়োজন আপনাদেরই জন্য;
মাংস, পোলাও, চপ‐কাটলেট, লুচি এবং মিষ্টি
খাবার সময় এদের প্রতি দেবেন একটু দৃষ্টি।”
বর আসেনি, তাই সকলে ব্যস্ত এবং উৎসুক,
আনন্দে আজ বুক সকলের নাচছে কেবল ধুক‐ধুক,
‘হুলু’ দিতে তৈরি সবাই, শাঁক হাতে সব প্রস্তুত,
সময় চলে যাচ্ছে ব’লে মনটা করছে খুঁত‐খুঁত!
ভাবছে সবাই কেমন ক’রে বরকে করবে জব্দ;
হঠাৎ পাওয়া গেল পথের মোড়ে গাড়ির শব্দ:
হুলুধ্বনি উঠল মেতে, শাঁক বাজল জোরে,
বরকে সবাই এগিয়ে নিতে গেল পথের মোড়ে।
কোথায় বরের সাজসজ্জা, কোথায় ফুলের মালা?
সবাই হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠে, পালা, পালা, পালা।
বর নয়কো, লাল‐পাগড়ি পুলিশ আসছে নেমে।
বিয়েবাড়ির লোকগুলো সব হঠাৎ উঠল ঘেমে,
বললে পুলিশ: এই কি কর্তা, ক্ষুদ্র আয়োজন?
পঞ্চাশ জনে কোথায়? এ যে দেখছি হাজার জন!
এমনি করে চাল নষ্ট দুর্ভিক্ষের কালে?
থানায় চলো, কাজ কি এখন এইখানে গোলমালে?
কর্তা হলেন কাঁদো কাঁদো, চোখেতে জল আসে,
গেটের পাশে জড়ো‐হওয়া কাঙালীরা হাসে॥
    

দুর্মর

হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলা দেশ
কেঁপে কেঁপে উঠে পদ্মার উচ্ছ্বাসে,
সে কোলাহলের রুদ্ধস্বরের আমি পাই উদ্দেশ
জলে ও মাটিতে ভাঙ্গনের বেগ আসে।

হঠাৎ নিরীহ মাটিতে কখন,
জন্ম নিয়েছে সচেতনতার ধান,
গত আকালের মৃত্যুকে মুছে
আবার এসেছে বাংলা দেশের প্রাণ

“হয় ধান নয় প্রাণ” এ শব্দে
সারা দেশ দিশাহারা,
একবার মরে ভুলে গেছে আজ
মৃত্যুর ভয় তারা।
সাবাস, বাংলা দেশ, এ পৃথিবী
অবাক তাকিয়ে রয়:
জ্বলে পুড়ে‐মার ছারখার
তবু মাথা নোয়াবার নয়।

এবার লোকের ঘরে ঘরে যাবে
সোনালী নয়কো, রক্তে রঙিন ধান,
দেখবে সকলে সেখানে জ্বলছে
দাউ দাউ করে বাংলা দেশের প্রাণ॥
    

মেয়েদের পদবী

মেয়েদের পদবীতে গোলমাল ভারী,
অনেকের নামে তাই দেখি বাড়াবাড়ি;
‘আ’কার অন্ত দিয়ে মহিলা করার
চেষ্টা হাসির। তাই ভূমিকা ছড়ার।
‘গুপ্ত’ ‘গুপ্তা’ হয় মেয়েদের নামে,
দেখছি অনেক চিঠি, পোস্টকার্ড, খামে।
সে নিয়মে যদি আজ ‘ঘোষ’ হয় ‘ঘোষা’,
তা হলে অনেক মেয়ে করবেই গোসা,
‘পালিত’ ‘পালিতা’ হলে ‘পাল’ হলে ‘পালা’
নির্ঘাৎ বাড়বেই মেয়েদের জ্বালা;
‘মল্লিক’ ‘মল্লিকা’, ‘দাস’ হলে ‘দাসা’,
শোনাবে পদবীগুলো অতিশয় খাসা;
‘কর’ যদি ‘করা’ হয়, ‘ধর’ হয় ‘ধরা’
মেয়েরা দেখবে এই পৃথিবীটা— “সরা”, 
‘নাগ’ যদি ‘নাগা’ হয় ‘সেন’ হয় ‘সেনা’,
বড়ই কঠিন হবে মেয়েদের চেনা॥
    

``নব জ্যামিতি''র ছড়া

Food Problem [একটি প্রাথমিক সম্পাদ্যের ছায়া অবলম্বনে]



সিদ্ধান্ত:
        আজকে দেশে রব উঠেছে, দেশেতে নেই খাদ্য;
        ‘আছে’, সেটা প্রমাণ করাই অধুনা ‘সম্পাদ্য’।


কল্পনা:
        মনে করো, আসছে জাপান অতি অবিলম্বে,
        সাধারণকে রুখতে হবে অতি দৃঢ় ‘লম্বে’।
        “খাদ্য নেই” এর প্রথম পাওয়া খুব ‘সরল রেখা’তে,
        দেশরক্ষার ‘লম্ব’ তোলাই আজকে হবে শেখাতে।


অঙ্কন:
        আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবীর ক্ষুদ্র বিন্দু থেকে,
        প্রতিরোধের বিন্দুতে নাও ঐক্য‐রেখা এঁকে!
        ‘হিন্দু‐মুসলমানে’র কেন্দ্রে, দুদিকের দুই ‘চাপে’
        যুক্ত করো উভয়কে এক প্রতিরোধের ধাপে।
        প্রতিরোধের বিন্দুতে দুই জাতি যদি মেলে,
        সাথে সাথেই খাদ্য পাওয়ার হদিশ তুমি পেলে।


প্রমাণ:
        খাদ্য এবং প্রতিরোধ উভয়েরই চাই,
        হিন্দু এবং মুসলমান মিলন হবে তাই।
        উভয়ের চাই স্বাধীনতা, উভয় দাবীই সমান,
        দিকে দিকে ‘খাদ্যলাভ’ একতারই প্রমাণ।
        প্রতিরোধের সঠিক পথে অগ্রসর যারা,
        ঐক্যবদ্ধ পরস্পর খাদ্য পায় তারা॥
    

আনুমানিক ১৯৪৩
সাপ্তাহিক জনযুদ্ধের কিশোর বিভাগের জন্য রচিত

অতি কিশোরের ছড়া

তোমরা আমায় নিন্দে ক’রে দাও না যতই গালি,
আমি কিন্তু মাখছি আমার গালেতে চুনকালি,
কোনো কাজটাই পারি নাকো বলতে পারি ছড়া,
পাশের পড়া পড়ি না ছাই পড়ি ফেলের পড়া।
তেতো ওষুধ গিলি নাকো, মিষ্টি এবং টক
খাওয়ার দিকেই জেনো আমার চিরকালের সখ।
বাবা‐দাদা সবার কাছেই গোঁয়ার এবং মন্দ,
ভাল হয়ে থাকার সঙ্গে লেগেই আছে দ্বন্দ্ব।
পড়তে ব’সে থাকে আমার পথের দিকে চোখ,
পথের চেয়ে পথের লোকের দিকেই বেশী ঝোঁক।
হুলের কেয়ার করি নাকো মধুর জন্য ছুটি,
যেখানে ভিড় সেখানেতেই লাগাই ছোটাছুটি।
পন্ডিত এবং বিজ্ঞজনের দেখলে মাথা নাড়া,
ভাবি উপদেশের ষাড়ে করলে বুঝি তারা।
তাইতো ফিরি ভয়ে ভয়ে, দেখলে পরে তর্ক,
বুঝি কেবল গোময় সেটা,— নয়কো মধুপর্ক।
ভুল করি ভাই যখন তখন, শোধরাবার আহ্লাদে
খেয়ালমতো কাজ ক’রে যাই, কষ্ট পাই কি সাধে?
সোজাসুজি যা হয় বুঝি, হায় অদৃষ্ট চক্র!
আমার কথা বোঝে না কেউ পৃথিবীটাই বক্র॥
    

পুরনো ধাঁধাঁ

বলতে পারো বড়মানুষ মোটর কেন চড়বে?
গরীব কেন সেই মোটরের তলায় চাপা পড়বে?
বড় মানুষ ভোজের পাতে ফেলে লুচি‐মিষ্টি,
গরীবরা পায় খোলামকুচি, একি অনাসৃষ্টি?
বলতে পার ধনীর বাড়ি তৈরি যারা করছে,
কুঁড়েঘরেই তারা কেন মাছির মতো মরছে?
ধনীর মেয়ের দামী পুতুল হরেক রকম খেলনা,
গরীব মেয়ে পায় না আদর, সবার কাছে ফ্যালনা।
বলতে পার ধনীর মুখে যারা যোগায় খাদ্য,
ধনীর পায়ের তলায় তারা থাকতে কেন বাধ্য?
‘হিং‐টিং‐ছট্‌‍’ প্রশ্ন এসব, মাথার মধ্যে কামড়ায়,
বড়লোকের ঢাক তৈরী গরীব লোকের চামড়ায়॥
    

সিপাহী বিদ্রোহ

হঠাৎ দেশে উঠল আওয়াজ— “হো‐হো, হো‐হো, হো‐হো”
চমকে সবাই তাকিয়ে দেখে— সিপাহী বিদ্রোহ!
আগুন হয়ে সারাটা দেশ ফেটে পড়ল রাগে,
ছেলে বুড়ো জেগে উঠল নব্বই সন আগে:
একশো বছর গোলামিতে সবাই তখন ক্ষিপ্ত,
বিদেশীদের রক্ত পেলে তবেই হবে তৃপ্ত!
নানাসাহেব, তাঁতিয়াটোপি, ঝাঁসীর রাণী লক্ষ্মী—
সবার হাতে অস্ত্র, নাচে বনের পশু‐পক্ষী।
কেবল ধনী, জমিদার আর আগের রাজার ভক্ত
যোগ দিল, তা নয়কো, দিল গরীবেরাও রক্ত!
সবাই জীবন তুচ্ছ করে, মুসলমান ও হিন্দু,
সবাই দিতে রাজি তাদের প্রতি রক্তবিন্দু;
ইতিহাসের পাতায় তোমরা পড় কেবল মিথ্যে,
বিদেশীরা ভুল বোঝাতে চায় তোমাদের চিত্তে।
অত্যাচারী নয়কো তারা, অত্যাচারীর মুণ্ড
চেয়েছিল ফেলতে ছিঁড়ে জ্বালিয়ে অগ্নিকুণ্ড।
নানা জাতের নানান সেপাই গরীব এবং মূর্খ:
সবাই তারা বুঝেছিল অধীনতার দুঃখ;
তাইতো তারা স্বাধীনতার প্রথম লড়াই লড়তে
এগিয়েছিল, এগিয়েছিল মরণ বরণ করতে!

আজকে যখন স্বাধীন হবার শেষ লড়াইয়ের ডঙ্কা
উঠছে বেজে, কোনোদিকেই নেইকো কোনো শঙ্কা;
জব্বলপুরে সেপাইদেরও উঠছে বেজে বাদ্য
নতুন ক’রে বিদ্রোহ আজ, কেউ নয়কো বাধ্য,
তখন এঁদের স্মরণ করো, স্মরণ করো নিত্য—
এঁদের নামে, এঁদের পণে শানিয়ে তোলো চিত্ত।
নানাসাহেব, তাঁতিয়াটোপি, ঝাঁসীর রাণী লক্ষ্মী,
এঁদের নামে, দৃপ্ত কিশোর, খুলবে তোমার চোখ কি?
    

উদ্যোগ

বন্ধু, তোমার ছাড়ো উদ্বেগ, সুতীক্ষ্ণ করো চিত্ত,
বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত।
মূঢ় শত্রুকে হানো স্রোত রুখে, তন্দ্রাকে করো ছিন্ন,
একাগ্র দেশে শত্রুরা এসে হয়ে যাক নিশ্চিহ্ন।
ঘরে তোল ধান, বিপ্লবী প্রাণ প্রস্তুত রাখো কাস্তে,
গাও সারিগান, হাতিয়ারে শান দাও আজ উদয়াস্তে।
আজ দৃঢ় দাঁতে পুজিত হাতে প্রতিরোধ করো শক্ত,
প্রতি ঘাসে ঘাসে বিদ্যুৎ আসে জাগে সাড়া অব্যক্ত।
আজকে মজুর হাতুড়ির সুর ক্রমশই করে দৃপ্ত,
আসে সংহতি; শত্রুর প্রতি ঘৃণা হয় নিক্ষিপ্ত।
ভীরু অন্যায় প্রাণ‐বন্যায় জেনো আজ উচ্ছেদ্য,
বিপন্ন দেশে তাই নিঃশেষে ঢালো প্রাণ দুর্ভেদ্য!
সব প্রস্তুত যুদ্ধের দূত হানা দেয় পুব‐দরজায়,
ফেণী ও আসামে, চট্টগ্রামে ক্ষীপ্ত জনতা গর্জায়।
বন্ধু, তোমার ছাড়ো উদ্বেগ, সুতীক্ষ্ণ করো চিত্ত,
বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত॥